৩ বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ৮ ‘ব্যাড বয়’

গত  তিন বছরে তিন ক্রিকেটারকে ফৌজদারি মামলায় যেতে হয়েছে কারাগারে। আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে উঠেছে নারীঘটিত কেলেঙ্কারি কিংবা স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগ। প্রত্যেকেই দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। সবশেষ এ তালিকায় যোগ হয়েছেন মোসাদ্দেক। তারকাখ্যাতি পাওয়া এ ক্রিকেটাররা কালো দাগ লাগিয়েছেন নিজেদের শুভ্র পোশাকে। বিব্রত করছেন বিসিবি ও দেশের ক্রিকেটকে। এভাবে চলতে থাকলে কদিন পর ‘ব্যাড বয়’ একাদশ করতে খুব বেশি কষ্ট হবে না!

রুবেল হোসেন
রুবেলের বিরুদ্ধে প্রেমের ফাঁদে ফেলে প্রতারণার অভিযোগ এনেছিলেন তাঁর কথিত এক বান্ধবী। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর রুবেলের বিরুদ্ধে মামলাও করেন ওই বান্ধবী। এ মামলায় ২০১৫ সালের ৮ জানুয়ারি জেলে যেতে হয় তাঁকে। পরে জামিন পেয়ে রুবেল যেতে পারেন বিশ্বকাপ খেলতে। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের আগে এই ঘটনা বেশ প্রভাব ফেলেছিল দলে। অস্বস্তি আর গুমোট একটা ভাব বিরাজ করছিল দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে। বিশ্বকাপে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া কঠিনই হয়ে যাচ্ছিল তখন। বিশ্বকাপের সাফল্য এ ঘটনা আড়াল করলেও এখনো নানা সময়ে ফিরে ফিরে আসে রুবেলের সেই বিতর্ক।

আল আমিন
আল আমিনের মাথায় যেন আকাশটাই ভেঙে পড়ল! ২০১৫ বিশ্বকাপের মাঝপথে জানলেন তিনি আর দলে নেই। টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে শুধু এতটুকুই জানানো হলো ‘শৃঙ্খলাভঙ্গে’র অভিযোগে তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। পরে জানা গেল, ২০১৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ব্রিসবেনে নিয়ম ভেঙে টিম হোটেলে ফিরেছেন রাত ১০টার পর। এ ঘটনায় লম্বা সময় আল আমিনকে দলের বাইরে থাকতে হয়েছে। পরে দলে ফিরেছিলেন। কিন্তু থিতু হতে পারেননি। ২০১৬ বিপিএলে আবারও তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বে আল আমিন কারও রুমে ঢুকছেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজে এটা দেখে জরিমানা করা হয় ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে চুক্তির অর্ধেক পরিমাণ অর্থ, অর্থাৎ প্রায় ১৩ লাখ টাকা।

শাহাদাত হোসেন
শাহাদাতের ঘটনাটা একটু ভিন্ন। ঠিক নারীঘটিত নয়, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ। এই অভিযোগে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শাহাদাত ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলার পর স্ত্রীকে নিয়ে কিছুদিন পালিয়েও ছিলেন শাহাদাত। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করে বিসিবি। ওই বছরের অক্টোবরে আত্মসমর্পণের পর তাঁকে জেলে যেতে হয়। ডিসেম্বরে জামিনে মুক্তি পাওয়া শাহাদাত পরে সমঝোতার মাধ্যমে মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

আরাফাত সানি
জাতীয় দলে আবদুর রাজ্জাকের দুয়ারটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাঁহাতি স্পিনে সাকিব আল হাসানের একজন সঙ্গী খুঁজে পেতে অনেক চেষ্টাই করেছেন নির্বাচকেরা। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে দলে এসেছিলেন সানি। ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বোলিং অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ভীষণ ধাক্কা খান বাঁহাতি স্পিনার। তবে সেটিও ছাপিয়ে যায় গত বছর জানুয়ারিতে যখন তাঁর বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা করেন সানির স্ত্রী পরিচয় দেওয়া এক তরুণী। এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া সানিকে রিমান্ড শেষে জেলে যেতে হয়। প্রায় দুই মাস জেল খেটে জামিনে মুক্তি পেলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আর ফিরতে পারেননি সানি।

মোহাম্মদ শহীদ
গত বছর জুলাইয়ের এক দুপুরে হঠাৎ দুই সন্তানকে নিয়ে বিসিবি কার্যালয়ে হাজির শহীদের স্ত্রী। বিসিবির প্রধান নির্বাহীকে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেন তিনি। জানিয়ে যান, সন্তান ও স্ত্রীর সঙ্গে কী আচরণ করছেন শহীদ। ঝামেলা মিটিয়ে নেওয়ার কথা বলে শহীদ অবশ্য ঘটনাটা আড়াল করার চেষ্টা করেন। ‘ঝামেলা মেটানো’ কী, সেটি বোঝা গেছে কদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহীদের নতুন বিয়ের ছবি প্রকাশ হলে।

সাব্বির রহমান
কোনো মামলা তাঁর বিরুদ্ধে এখনো হয়নি। কোনো নারী তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এখনো বিসিবিতে আসেননি কিংবা প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমকে কিছু বলেননি। তবুও সাব্বিরের নামের পাশে ‘ব্যাড বয়’ তকমা বসতে অসুবিধা হয়নি। গত ডিসেম্বরে জাতীয় লিগের ম্যাচ চলার সময় কিশোর দর্শককে মারধরের অভিযোগে ২০ লাখ টাকা জরিমানা ও ৬ মাস ঘরোয়া ক্রিকেটে নিষেধাজ্ঞার ঘটনাটা তো আছেই। এ ছাড়াও বর্তমান জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে নারীঘটিত ঘটনায় যার নাম বারবার উচ্চারিত হচ্ছে তিনি সাব্বির।
২০১৬ বিপিএলের চট্টগ্রাম পর্বে হোটেল কক্ষে নারী অতিথি নিয়ে যাওয়ার অপরাধে তাঁকে ১৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। শোনা যায়, গত জানুয়ারিতে সিলেটে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজের শেষ টি-টোয়েন্টিতে সাব্বির একাদশের বাইরে ছিলেন যতটা না পারফরম্যান্স, তার চেয়ে বেশি শৃঙ্খলাজনিত কারণে। গত জুনে দেরাদুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে শেষ টি-টোয়েন্টিতে একাদশের বাইরে ছিলেন সতীর্থ মেহেদী হাসান মিরাজকে মারধরের অভিযোগে। সবশেষ ক্যারিবীয় সফরে গায়ানায় সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতেও সাব্বিরকে পুরোনো রোগটা পেয়ে বসেছিল।

নাসির হোসেন
নাসিরের বিরুদ্ধেও কোনো মামলা এখনো হয়নি। তবে তাঁর নারীসঙ্গ নিয়ে অনেক কথাই চালু ক্রিকেট-অঙ্গনে। নাসিরের মোবাইল সিম ও বান্ধবী সংখ্যা নিয়ে বিসিবি সভাপতির সেই মন্তব্য তো এখনো মানুষের মুখে মুখে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেই ধারাবাহিক ভালো করা নাসির পথ হারিয়ে ফেলেছেন অনেক দিন হলো। ক্যারিয়ারের এই দুঃসময়ে নাসির কদিন আগে ভীষণ আলোচিত হয়েছেন তাঁর এক কথিত মডেল বান্ধবীর সৌজন্যে। গত জুনে সেই বান্ধবী নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে ‘বোমা’ ফাটাতে শুরু করলেন, শুধু সতীর্থ খেলোয়াড়েরাই নয়, ভীষণ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় পুরো বিসিবি।

মোসাদ্দেক হোসেন
বিতর্কিত ক্রিকেটারদের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন মোসাদ্দেক। ১৬ বছর বয়সে খালাতো বোনকে বিয়ে করেছিলেন। গত ১৬ আগস্ট স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছেন। মোসাদ্দেকের স্ত্রী সামিনা শারমীন ২৬ আগস্ট রোববার ময়মনসিংহের আদালতে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছেন। নির্যাতনের বিভিন্ন সময়ে ছেলের পক্ষ নিয়ে মৌন থাকা ও ছেলেকে সহযোগিতা করায় মোসাদ্দেকের মা পারুল বেগমকেও আসামি করেছেন সামিনা। স্ত্রীর পরিবারের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর মোসাদ্দেকের নাকি মাথা ঘুরে গেছে!

মোসাদ্দেক অবশ্য এখনো পুরোপুরি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। সাংবাদিকেরা কথা বলা চেষ্টা করেও সফল হয়নি। ফলে একপক্ষের বক্তব্য শুনেই তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়তো ঠিক হচ্ছে না। তবে এই ঘটনার সূত্র ধরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অন্যান্য ঘটনাও উঠে এল। এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের খবর ফলাও করে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও প্রচার হয়। ৩ বছরে অন্তত আট ক্রিকেটারকে জড়িয়ে এমন নেতিবাচক খবর…সতর্কঘণ্টা বাজিয়ে তো দিচ্ছেই!

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ