আসছে ভোট :ঢাকা-১০

যোগ্য প্রার্থীর খোঁজে বিএনপি

ঢাকা-১০ (ধানমণ্ডি-কলাবাগান-হাজারীবাগ-নিউমার্কেট) আসনে বারবার প্রার্থী বদলের কারণে বিএনপির স্থায়ী কোনো নেতা গড়ে ওঠেনি। নতুন কোনো নেতৃত্বও উঠে আসছে না এখান থেকে। বিশেষ করে প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপরীতে দাঁড়ানোর মতো শক্ত ও যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া অনেকটাই দুস্কর হয়ে উঠেছে। ফলে আগামী নির্বাচনে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের ওপরই মূলত নির্ভর করছে বিএনপির ভাগ্য তথা জয়-পরাজয়ের বিষয়টি। এই অবস্থায় বিএনপি থেকে দুই তরুণ নেতা আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তৎপরতা চালাচ্ছেন। দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় থাকা এই দুই নেতা হচ্ছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম এবং নির্বাহী সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক শেখ রবিউল আলম রবি। ঢাকা মহানগরের ধানমণ্ডি থানা বিএনপির সভাপতি পদেও রয়েছেন রবি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের নির্বাচনী তৎপরতা মূলত এই দুই নেতাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।

ঢাকা মহানগরীর ধানমণ্ডি, কলাবাগান, হাজারীবাগ ও নিউমার্কেট থানা নিয়ে ঢাকা-১০ আসন গঠিত। সেনাসমর্থিত গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন ঢাকা-৯ আসন ভেঙে ঢাকা-১২ নামে আসনটি গঠন করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আবারও সংসদীয় এলাকার কিছুটা রদবদল করে ঢাকা-১০ নামে আসনটি পুনর্গঠন করা হয়।

এই আসনে আওয়ামী লীগ গত দুটি নির্বাচনের মাধ্যমে স্থায়ী প্রার্থী নির্ধারণ করতে পারলেও বারবার প্রার্থী বদল করার কারণে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কেউই নিশ্চিত নন। দলের প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো সময় স্থানীয় নেতাদেরও প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। ফলে এলাকায় নির্ধারিত ও একক দায়িত্বশীল কোনো নেতা সৃষ্টি না হওয়ায় দলের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাননি স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এবার এই অবস্থার পরিবর্তন চান দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। বাইরে থেকে ‘ভাড়াটে’ কোনো প্রার্থী না দেওয়ার জন্য কেন্দ্রের প্রতি দাবি জানিয়েছেন তারা।

এখানে পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত মোট পাঁচবার বিএনপির প্রার্থী বদল করা হয়েছে। যাদের সবাই ছিলেন অস্থানীয়। এর মধ্যে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। পরে খালেদা জিয়া আসনটি ছেড়ে দিলে উপ-নির্বাচনে জয়ী হন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা ষষ্ঠ নির্বাচনে এমপি হন দলের তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ। একই বছরের ১২ জুনের সপ্তম নির্বাচনে আবারও প্রার্থী পাল্টায় বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সেক্টর কমান্ডার মে. জে. (অব.) মীর শওকত আলী বীরউত্তম ধানের শীষ নিয়ে লড়াই করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মকবুল হোসেনের কাছে হেরে যান। ২০০১ সালের অষ্টম নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হয়ে জয়ী হন খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ। তবে ২০০৮ সালের নবম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে হেরে যান তিনি। ২০১৪ সালের দশম নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও তার মিত্ররা।

আগের পাঁচটি নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে মীর শওকত আলী ও খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ মারা গেছেন। জমিরউদ্দিন সরকার ও খালেদা জিয়ার এখান থেকে নির্বাচন করার সম্ভাবনা নেই বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তাই এখানে আগামী নির্বাচনে নতুন মুখ আসছে- সেটা এক রকম নিশ্চিত।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক এই আহ্বায়ক বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় জিয়া পরিবারের প্যানেল আইনজীবী হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রেখে দলে অবস্থান গড়েন তিনি। ২০০৮-এর নির্বাচনে এই আসনে দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। বিএনপির দ্বিতীয় প্রধান নেতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে- এমনটি জানিয়ে তার অনুসারীরা দাবি করছেন, কেন্দ্র থেকে তার মনোনয়ন পাওয়া অনেকটা নিশ্চিত।

অবশ্য তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন, ব্যারিস্টার অসীম কয়েক বছর ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। ফলে বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে তাকে পাওয়া যায়নি। নির্যাতিত নেতাকর্মীদের কোনো সহযোগিতা ও খোঁজ-খবর রাখেন না তিনি। সম্প্রতি তার শাশুড়ির মৃত্যুর কারণে দুই দিনের জন্য ঢাকা এলেও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এছাড়া ২০১৬ সালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে রাজনৈতিক সহকর্মীদের হাতে নিহত ধানমণ্ডি থানা শ্রমিক দলের সভাপতি বাবুল সরদার হত্যায় অসীমের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ আছে, শ্রমিক দলের কমিটি নিয়ে ফেসবুকে বাবুলের দেওয়া একটি পোস্টকে ঘিরে অসীমের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। এর জের ধরেই এই হত্যাকা সংঘটিত হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের পর ব্যারিস্টার অসীমকে হুকুমের আসামি করে মামলাও করেন বাবুলের স্ত্রী। যদিও সে সময় লন্ডনে অবস্থান করছিলেন অসীম। এরপরও ওই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার কারণে নেতাকর্মীর কাছে বিরাগভাজন হয়ে আছেন তিনি।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী শেখ রবিউল আলম রবিও এলাকায় কাজ করে যাচ্ছেন। নির্যাতিত নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। বর্তমান সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে দেড় শতাধিক মামলা পার হয়েছে, ছয়বার কারাগারেও যেতে হয়েছে। ছাত্রদলের সাবেক এ নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর ওয়ার্ড ও থানা হয়ে নগর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। এখন দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক ছাড়াও কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটিতে তাকে ধানমণ্ডি থানা বিএনপির সভাপতি করা হয়েছে। এর আগে তিনি ধানমণ্ডি থানা বিএনপির সদস্য সচিব ছিলেন। এলাকায় দলের সব অঙ্গ সংগঠন তার পাশে থাকায় আগামী নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্তি অনেকটা নিশ্চিত বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। এদিকে বিএনপির সকল কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে মামলা-হামলায় পর্যবসিত এই নেতা দলকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার কারণে দলীয় হাইকমান্ডেরও সুদৃষ্টিতে রয়েছেন তিনি।

নির্বাচনের বিষয়ে লন্ডনে অবস্থান করা ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন আহমেদ অসীমের বক্তব্য জানা যায়নি। তার লন্ডনের মোবাইল নাম্বারে একাধিক মেসেজ দিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে নিজের আগ্রহের কথা জানিয়ে শেখ রবিউল আলম রবি সমকালকে বলেন, ২৮ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির অনুকূল-প্রতিকূল সব পরিস্থিতিতেই এই এলাকার নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন তিনি, আগামীতেও থাকবেন। এ এলাকায় তার জন্মস্থান হওয়ায় সাধারণের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ কারণে এলাকার নেতাকর্মীসহ সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষও তাকে ঢাকা-১০ আসনের বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান। বিগত দিনের এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবদান বিবেচনা করে দল তাকে মূল্যায়ন করবে বলেই তার দৃঢ় বিশ্বাস। আর দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনিও তার পক্ষে ভোটবিপ্লব ঘটিয়ে প্রতিদান দেবেন।

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ