প্রতিপক্ষকে সামলাতে হিমশিম অবস্থা মন্ত্রীর

কোনো সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন এলে ভোটের ফলও যে পাল্টে যেতে পারে, তার বড় উদাহরণ ঢাকার কেরানীগঞ্জ। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ উপজেলা একটি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তিনটি সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি। ২০০৮ সালে কেরানীগঞ্জ উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭টি, সাভার উপজেলার ৩টি ইউনিয়ন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩টি ওয়ার্ড যুক্ত করে ঢাকা-২ সংসদীয় আসন পুনর্গঠন করা হয়। এরপর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাল্টে যায় ভোটের ফল। জয়ী হয় আওয়ামী লীগ।
এই আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংসদ কামরুল ইসলাম সরকারের খাদ্যমন্ত্রী। দলীয় কোন্দলের কারণে তিনি এবার আর আওয়ামী লীগে একক প্রার্থী নন। তাঁর শক্ত প্রতিন্দ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগেরও আহ্বায়ক। এই দুই নেতাকে কেন্দ্র করে বিভক্ত নেতা-কর্মীরা। কেরানীগঞ্জের সাতটি ইউনিয়নে শাহীন আহমেদের অবস্থান বেশ শক্ত। অন্য দিকে সাভারের তিনটি ইউনিয়ন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটির তিনটি ওয়ার্ডে মন্ত্রীর অনুসারীদের অবস্থান শক্ত।

১৯৯১ থেকে ২০০১ এর নির্বাচন পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ উপজেলা একটি সংসদীয় আসন হিসেবে ঢাকা-৩ নামে পরিচিত ছিল। ওই সময়ে অনুষ্ঠিত সব কটি সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন বিএনপির আমানউল্লাহ আমান। ২০০৮ এ কেরানীগঞ্জ উপজেলা ভেঙে দুটি আসন (ঢাকা-২ ও ঢাকা-৩) করা হলে দুটিতেই জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আসনটি পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা নিয়েও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। কেরানীগঞ্জ উপজেলার বাকি পাঁচটি ইউনিয়ন এখন ঢাকা-৩ আসনের অন্তর্ভুক্ত।

২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেননি আমানউল্লাহ আমান। তখন ঢাকা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মতিউর রহমান। তাঁকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সাংসদ হন কামরুল ইসলাম। পরে আইন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন তিনি। দল থেকে আবারও মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। যদিও তাঁর মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগ।

এই আসনে অর্ধেকের বেশি ভোটার সাভার উপজেলার তেঁতুলঝোড়া, ভাকুর্তা ও আমিনবাজার ইউনিয়ন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা বলছেন, এসব এলাকার কর্মীদের কাছে কামরুল ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। অন্যদিকে অর্ধেকের কাছাকাছি ভোটারের বাস কেরানীগঞ্জের হজরতপুর, কলাতিয়া, রোহিতপুর, তারানগর, শাক্তা, কালিন্দী ও বাস্তা ইউনিয়নে। এসব এলাকায় দলের প্রভাব রয়েছে উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের। এই সাত ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতা-কর্মী তাঁর অনুসারী। তিনিও আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিভক্তির বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলার তারানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন বলেন, মন্ত্রীকে মানুষ সেভাবে পায় না। উপজেলা চেয়ারম্যানকে সব সময় কাছে পাওয়া যায়।
অন্যদিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ইউসুফ আলী চৌধুরী বলেন, কামরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হলে সবাই একসঙ্গে কাজ করবে। অন্য কাউকে প্রার্থী করা হলে দলে দ্বন্দ্ব তৈরি হবে।

তবে নির্বাচন নিয়ে নেতা-কর্মীদের আগ্রহ আর স্থানীয় মানুষের ভাবনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন, জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের আরশিনগর এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক (৫৭) বলেন, ‘অনেক দিন ধইরা আটিবাজারের সামনের সেতু নষ্ট। আওয়ামী লীগ দুইবার ক্ষমতায় থাইকা দেশ শাসন করছে। কিন্তু সেতুটা ঠিক হয় নাই। এবার ভোট দিমু খুব বুইঝা-শুইনা।’
ঢাকা-২ আসনের অন্তর্ভুক্ত সাভার উপজেলার ভাকুর্তা ইউনিয়ন। স্থানীয় আউয়াল মার্কেটের মুদি দোকানদার রমিজ উদ্দিন মিয়া (৪৫) বলেন, ‘যারা উন্নয়ন করব, তাগো ভোট দিমু।’

এলাকার রাজনীতি সম্পর্কে কামরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটি বহাল থাকায় কেরানীগঞ্জ আওয়ামী লীগে স্বেচ্ছাচারিতার চর্চা চলছে। তিনি বাধা দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড থামাতে পারেননি। দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি এলাকা থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বাকি দুটি এলাকার লোক মেনে নেবেন না। পুরো নির্বাচনী এলাকার ত্যাগী কর্মীরা তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক হওয়ার পর অনুসারীদের নিয়ে দলে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন শাহীন আহমেদ। এ পর্যন্ত দুবার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এলাকায় একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। মন্ত্রী কামরুলের অনুসারীদের অভিযোগ, কেরানীগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ শাহীনের কাছে। স্থানীয় লোকজন তাঁকে ভয় পায়।
অভিযোগের বিষয়ে শাহীন আহমেদ বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। দলকে সুসংহত করে নিজস্ব ভোটব্যাংক তৈরি করতে পেরেছেন তিনি। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী পরিবর্তন চান ভোটাররা।

বিএনপিতে একক প্রার্থী
১৯৯১ থেকে একটানা ১৫ বছর কেরানীগঞ্জের সাংসদ ছিলেন আমানউল্লাহ আমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি আমান এবারও ঢাকা-২ আসনের একক প্রার্থী। নেতা-কর্মীরা বলছেন, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতা গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে থাকেন। আতঙ্কের কারণে অনেকেই মাঠে সক্রিয় না। তবে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে ঐক্যবদ্ধভাবেই আমানের পক্ষে কাজ করবেন সবাই।
এ বিষয়ে আমানউল্লাহ আমান প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে হারার নজির নেই তাঁর।

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ