নারী পোশাক শ্রমিকদের জীবনের অংশ যেন ‘যৌন হয়রানি’

রাজধানীর তেজগাঁয়ের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করত ১৭ বছর বয়সী শিউলী (ছদ্মনাম)। আড়াই বছর ওই কারখানার সুইং সেকশনে কাজ করে সে। গত ছয় মাস ধরে প্রোডাকশন ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম নানাভাবে তাকে হয়রানি করে আসছিলেন। শুরুটা হয়েছিল ‘মেয়ের বয়সী’ বলে। কিন্তু মেয়ের বয়সী বললেও আদরটা সে রকম ছিল না- তা বুঝতে দেরি হয়নি শিউলীর।

কিন্তু সে কথা কাউকে বলতে পারেনি শিউলী, নিরুপায় হয়ে চাকরিটাই ছেড়ে দিতে হয়েছে।

নিপার (ছদ্মনাম) বয়স ৩২ বছর। ফ্লোর ম্যানেজার শফিক নিয়মিত অশ্লীল ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন। শফিক জানতেন, সাড়ে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে নিপা একা থাকেন। ‘স্বামী নেই’ অজুহাতে নানা ধরনের প্রস্তাব দিতে থাকেন শফিক, কিন্তু শিউলীর মতো চাকরি ছেড়ে দিতে পারছেন না নিপা। বলেন, স্বামীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওনের পর বাপ-ভাইয়ের সংসারে থাকবার পারি নাই। চাকরি না করলে মাইডারে নিয়া খামু কী। আর এই ফ্যাক্টরি থেইকা গেলেই তো ভালা জায়গায় যাইবার পারুম না, সব জায়গাতেই হুনি এমন মানুষে ভর্তি। তাইলে আর কই যামু- কোনোভাবে মুখ গুঁজে এখানে পইড়া আছি। কিছুতো করার নাই!

শিউলী এবং নিপার মতো অভিজ্ঞতা প্রায় প্রতিটি পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের। কোনো-না কোনোভাবে কারখানার পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। কর্মক্ষেত্রে এবং কাজে আসা-যাওয়ার পথেও তাদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি, কারখানায় প্রবেশের সময় তাদের দেহ তল্লাশি করে পুরুষ নিরাপত্তাকর্মী।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ আদালত থেকে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অথচ কারখানাগুলোতে সেই নির্দেশনা পৌঁছায়নি। মালিকপক্ষও এ বিষয়ে নির্বিকার। বরং নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি সেখানে ‘ওপেন সিক্রেট’ একইসঙ্গে ‘আনটোল্ড স্টোরি’।

বাংলাদেশ শ্রম ইনস্টিটিউট (বাশি) বলছে, কারখানায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা নারী শ্রমিকদের যৌন হেনস্তা- এটা তাদের জীবনের অংশ। শুধু তাই নয়, যে সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদে আওয়াজ তুলেছিল- সেখানেও পুরুষ সহযোদ্ধাদের থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না নারীরা।

কর্মজীবী নারী’র করা ‘এস্টেট অব রাইটস ইমপ্লিমেন্টেশন অব উইম্যান রেডিমেড গার্মেন্টস ওয়াকার্স’ শীর্ষক এক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের পোশাক তৈরি কারখানাগুলোতে শতকরা ১৩ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার।

এদিকে ২০০৯ সালে যৌন হয়রানি নিয়ে উচ্চ আদালতের দেওয়া গাইড লাইন সর্ম্পকে পোশাক কারখানাগুলোত কোনো নির্দেশনা পৌঁছায়নি। এই প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য এবং কর্মজীবী নারী’র উপদেষ্টা শিরিন আখতার সারাবাংলাকে বলেন, এই গাইড লাইনের প্রচার নেই। কিন্তু জানান দেওয়া দরকার যে অশালীন আচরণ করা যাবে না।

তিনি বলেন, শ্রম আইনে অশালীন আচরণ সর্ম্পকে বলা হলেও সেখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ নেই। অশালীন আচরণ বলতে কী বোঝায়, এর শাস্তি কী এবং কতটুকু- সে বিষয়ে কিছুই নেই। যখন তখন গায়ে হাত দিয়ে কথা বলা, যার গায়ে হাত দেওয়া হয় তিনিই কেবল বুঝতে পারেন এটা কেমন অনুভূতি। এই মানসিকতা বদলাতে না পারলে এই সংকট মোকাবিলা করা মুশকিল হয়ে যাবে।

শ্রমিক নেতা জলি তালুকদার বলেন, কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখেছি, শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে এবং বাইরে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে এবং সেটা ব্যাপক মাত্রায়। কেবল যৌন হয়রানিই নয়, কারখানার ভেতরে খুব খারাপ ভাষায় গালাগালি করা নিত্য ঘটনা। অশ্লীল ভাষায় কথা, অশ্লীল ইঙ্গিত করা এমনকি যে কোনো অজুহাতে গায়ে হাত দেওয়ার প্রবণতা কারখানাগুলোতে খুবই প্রকট।

আশার কথা হচ্ছে, নারীরা এখন প্রতিবাদ করতে শিখেছে, যেটা আজ থেকে ১০ বছর আগে চিন্তাও করা যেত না। শ্রমিকরা এখন কারখানার ভেতরে এবং রাস্তায় প্রতিবাদ করতে শিখেছে। জলি তালুকদারের ভাষায়, নারীরা এখন মুখ খুলছে, তারা যৌথভাবে প্রতিরোধ করছে। যাতায়াতের পথে এবং কারখানার ভেতরেও।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন কিছুদিন আগে কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি নিয়ে কাজ করেছেন। জানতে চাইলে তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের দেওয়া গাইডলাইন বিষয়ে কোনো ধারণা নেই, কিছু জানে না মালিকপক্ষ। কোনো কারখানাতে কমিটিও নেই। গাইড লাইনে বলা হয়েছিল, কমপ্লেইন্ট কমিটি করতে হবে, যৌন হয়রানি কী, কিভাবে সেটাকে অ্যাড্রেস করতে হবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কিন্তু এর কিছুই হয়নি কারখানাগুলোতে।

পোশাক কারখানাগুলোতে যৌন হয়রানি এবং সেগুলোকে অ্যাড্রেস করার বিষয়গুলো এত দুর্বল- অথচ কেউ কোনো কথাও বলে না। তাজরিন এবং রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিষয়ে কিছুটা সচেতনতার সৃষ্টি হলেও সুরক্ষার বিষয়ে ভাবা হয়নি। নিরাপত্তার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে কারণ বায়ারদের চাপ ছিল। ‘যৌন হয়রানি আনটোল্ড ট্রুথ অ্যান্ড ওপেন সিক্রেট’ বলেন তাসলিমা ইয়াসমিন।

তিনি আরও বলেন, পোশাক কারখানার মালিকরা সমাজের এতো উচ্চ পর্যায়ের যে তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। সরকারের একটি মনিটরিং কমিটি থাকার কথা, যারা কারখানাগুলোতে এই বিষয়ে খোঁজ নেবে, উচ্চ আদালতের গাইড লাইন বাস্তবায়নে কাজ করবে। একটি আলাদা আইন থাকা দরকার, সরকারি মেকানিজম হিসেবে যারা কারখানাগুলোতে মনিটর করবে। এই কমিটি কারখানাগুলোতে উচ্চ আদালতের গাইড লাইনের ধারণা দেবে।

সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। কিন্তু কোনো কর্তৃপক্ষ নেই যারা এ বিষয়ে তদারকি করবে। বর্তমান চিত্র হলো কারখানাগুলোতে যৌন হয়রানি সবাই যেন মেনেই নিয়েছে, বলেন তাসলিমা ইয়াসমিন।

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ