হোলি আর্টিজান হামলায় জড়িত তামিমসহ জঙ্গিরা জামিন পাচ্ছে

  • জঙ্গিদের জামিন হওয়ার প্রধান কারণ মামলার এজাহারে অসংগতি
  • অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া
  • মামলা দায়েরে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি।

র‍্যাবের খাতায় তামিম দ্বারী ‘ভয়ংকর’ সন্ত্রাসী। তিনি গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সারওয়ার-তামিম নিহত হওয়ার পর দল গোছানোর চেষ্টা করছেন। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি র‍্যাব তাঁকে যাত্রাবাড়ীর একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ, জিহাদি বই ও প্রচারপত্র উদ্ধার হয়।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তারের পর তামিম দ্বারীর জামিন হয়ে যায়। র‍্যাব দাবি করেছিল, ২০১৪ সালে তামিম দ্বারীর আমন্ত্রণে তামিম চৌধুরী পতেঙ্গায় গেছেন এবং নৌপথে জিহাদের রসদ এনে দেওয়ার ব্যাপারে দুজনের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এত অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, তিনি জামিন পেলেন কী করে? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তামিম দ্বারীর পক্ষে আইনজীবী জামিন আবেদনের সময় আদালতে একটি চিঠি জমা দিয়েছিলেন। চিঠিটি নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ট্রেনিং একাডেমির (আইএমটিএ) অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন জাফর আহমেদের লেখা। তিনি লিখেছেন, মার্চেন্ট মেরিন অফিসার তামিম দ্বারী সিওসি পরীক্ষার্থী। তাঁকে ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি ভোর পাঁচটার দিকে আইএমটিএ হোস্টেল থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে র‍্যাব বলেছে, যাত্রাবাড়ী থানার কাছে দনিয়ার কবিরাজবাগ এলাকার একটি ছয়তলা বাড়ির দোতলা থেকে সহযোগীসহ তামিম দ্বারী গ্রেপ্তার হন। আইএমটিএ থেকে দেওয়া চিঠিতে যে ঘটনাস্থল ও তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে এজাহারের বর্ণনার মিল না থাকায় আসামি জামিন পান বলে মনে করেন তাঁর আইনজীবীরা। কমপক্ষে দুজন আইনজীবী মামলার নথিপত্র দেখে বলেছেন, আদালত বুঝতে পেরেছেন ঘটনাটি সাজানো।
তামিম দ্বারীর গ্রেপ্তার ও জামিন প্রসঙ্গে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান প্রথম আলোর কাছে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেছেন, জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার। এ বিষয়ে র‍্যাবের কিছু বলার নেই।
প্রতিবেদনটি তৈরির সময় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া ১০টি মামলার নথিপত্র খতিয়ে দেখা হয় এবং এ বিষয়ে কথা হয় তিনজন আইনজীবীর সঙ্গে। আইনজীবীরা উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, আগে তুলে নিয়ে পরে গ্রেপ্তার দেখানো, মামলার এজাহারের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার মিল না থাকা, এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো কয়েকজন আসামির মধ্যে সম্পর্ক বা তাঁদের সঙ্গে ঘটনার সম্পৃক্ততা প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ইত্যাদি কারণে জামিন হচ্ছে।
হাইকোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ আলী সন্দেহভাজন জঙ্গি রেদোয়ানের পক্ষে জামিন আবেদন করেছিলেন। গত ২৪ মার্চ তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রেদোয়ানকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে তাঁর বাবার দোকান থেকে অজ্ঞাতনামা কয়েকজন তুলে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ছিল। রেদোয়ানের বাবা থানায় গেলে পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে তিনি আদালতে বিশেষ জিডি করেন। একজন ম্যাজিস্ট্রেট ওই জিডির তদন্ত করার সময় রেদোয়ানকে ঢাকার হাতিরঝিল থেকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালত মনে করেছেন, রেদোয়ান সুবিচার পাননি। পরে তিনি জামিন পান।

একেকজনকে একেক জায়গা থেকে তুলে নিয়ে এসে একটি দল হিসেবে উপস্থাপনের ঘটনায় বেশ কিছু আসামি জামিন পেয়েছেন। গেল বছর নরসিংদীর গাবতলীতে র‍্যাব-১১ অভিযান চালিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. সালাউদ্দিন ও নরসিংদী সরকারি কলেজের ছাত্র মো. আবু জাফর নামের দুই ছাত্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে। ওই মামলায় ঢাকার দুজন, বাগেরহাটের দুজন, বরগুনার একজনসহ অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। ছাত্র দুজনের আইনজীবী ইকবাল সরকার প্রথম আলোকে বলেন, এজাহারে যাঁদের নাম রয়েছে তাঁদের সবাইকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর মক্কেলের ব্যাপারে কেউ কোনো তথ্যই দিতে পারেননি।

প্রক্রিয়াগত ত্রুটির ঘটনায় জামিন পেয়েছেন মুফতি জাফর আমিন। ২০১৫ সালের ২ জুলাই মুফতি জাফর আমিনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয় দারুস সালাম থানায়। তবে এর দুদিন আগে জাফর আমিনের ভাই মোয়াজ আমিন টঙ্গী মডেল থানায় একটি অভিযোগ করেন, ১৪ জুন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাঁর ভাইয়ের কর্মস্থল আকায়েদে মদিনা মাদ্রাসার সামনে থেকে অজ্ঞাতনামা লোকজন দুটি মাইক্রোবাসে করে এসে অস্ত্রের মুখে জাফর আমিনকে তুলে নিয়ে যায়। তবে দারুস সালাম থানায় দায়ের হওয়া মামলার এজাহারে র‍্যাব-২ জানায়, মুফতি জাফর আমিনকে সদরঘাটের শাহি মদিনা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকে সলাপরামর্শ করার সময় কয়েকজন সঙ্গীসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানান, তাঁরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের আরও কয়েকজন সহযোগী খুলনা থেকে ওই দিন সন্ধ্যায় এয়ারপোর্ট স্টেশনে নামবেন বলেও জানান তাঁরা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাঁরা আসামিদের নিয়ে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে অভিযান চালান।
আইনজীবীরা বলছেন, এ ঘটনায় কয়েকটি অসংগতি ছিল। জাফরকে যেখান থেকে তোলা হয়, সে জায়গা থেকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। এ নিয়ে আগেই টঙ্গী মডেল থানায় অভিযোগ ছিল। সদরঘাট থেকে গ্রেপ্তার হলে মামলা হওয়ার কথা কোতোয়ালি থানায়। তা না হয়ে র‍্যাব মামলা করেছে দারুস সালাম থানায়।
দিনাজপুরে ২০১০ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলায় আসামিদের সবাই জামিন পান অন্য ধরনের প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলা দায়রা জজ আদালতে বিচার হওয়ার কথা এবং বিচার শুরুর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। ওই আদালত নথিপত্রে নিজেকে সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল বলে পরিচয় দেন। আর বিচার শুরুর আগে কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও নেয়নি।
কুমিল্লায় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর মামলা হয়। যে মামলাটি হয়েছিল, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি হতো ১০ বছর। ১০ বছরেও বিচার শেষ না হওয়ায় আসামিরা জামিন পান।
উচ্চ আদালতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলা নিয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন আইনজীবীরা বলছেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ১২০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই শর্ত মানছে না। তারা নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদনও দেয় না। মামলাগুলো দিনের পর দিন ঝুলে থাকায় আসামিদের জামিন হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পুলিশের অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক শফিকুর রহমান প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, আগে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে গ্রেপ্তারের অভিযোগ সত্য নয়। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আসামি গ্রেপ্তার করা হয় এবং তা সংবাদমাধ্যমগুলো ফলাও করে প্রচার করে।
তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেছেন, জঙ্গিরা সাধারণ অপরাধীদের মতো নয়। তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন, তথ্য আদায় আরও কঠিন। আস্থায় না এনে তাদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সে কারণে সময় বেশি লাগে। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব করা হয়েছে।
পুলিশ মনে করছে, আদালত অন্য অপরাধীদের বিচার যেভাবে করেন, জঙ্গিদের বিচারও সেভাবে করতে চান। সে কারণে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি তাঁরা বুঝতে চান না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই জঙ্গি হামলার প্রমাণাদি খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাদের গ্রেপ্তার করা, কথা আদায় করা কঠিন কাজ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ আদালত এ ধরনের অপরাধের বিচার করে থাকেন। বাংলাদেশেও তেমনটা প্রয়োজন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রায়ই আগে তুলে এনে পরে গ্রেপ্তারের অভিযোগ ওঠে। এতে করে মামলা দুর্বল হয় এবং সত্যিকারের জঙ্গিও লাভবান হয়। এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না।

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ