পথশিশুরা মাদকাসক্ত বেশী হয়

‘ছোট বেলায় বন্ধুদের কাছ থেকে সিগারেট নিয়া খাইছি। তারপর থাইকা গাঁজা আর ফেন্সিডিল খাওয়া ধরছি। ভালোই লাগে খাইতে।’ কথাগুলো বলছিল শয়ন নামে ১৫ বছরের এক শিশু। শয়নের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায়। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাবার সাথে ঢাকার এক বস্তিতে থাকতো সে। কিছুদিন আগে বাবা আরেকটি বিয়ে করে। এরপর থেকে আলাদা থাকে শয়ন। ট্রাকের হেলপার হিসেবে কাজ করে প্রতিদিন ২৫০ টাকা পায়। প্রায় সব টাকাই নেশার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়।
ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা নদী। নদীর বেড়ি বাঁধের পাশেই ছোট একটি ছাউনি। এর মধ্যে বাস করে প্রায় ১০/১৫ জন শিশু। সারাদিন বিভিন্ন ধরনের ভাঙ্গারী সংগ্রহ করে সন্ধ্যায় ফিরে আসে ছাউনিতে। তারপর প্রায় সবাই পলিথিন মুখে দিয়ে কি যেনো করে? তাদের মধ্যে সুজন নামে এক শিশুকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে জানায়, ‘ড্যান্ডি লইতে লইতে জীবনটা পেলাসটিক হইয়্যা গেল।’ তখনই বোঝা গেলো এটি একটি নেশা, আর এই নেশার নাম ‘ড্যান্ডি’।’
সম্প্রতি ‘ড্যান্ডি’ নামে নতুন ও সহজলভ্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে বেশিরভাগ বস্তির সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা। ড্যান্ডি এক ধরনের আঠা, যা মূলতঃ সলিউশন নামে পরিচিত। এতে টলুইন নামে এক প্রকার উপাদান থাকে। টলুইন মাদকদ্রব্যের তালিকায় আছে। এটি জুতা তৈরি ও রিকশার টায়ার-টিউব লাগানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। এই আঠা পলিথিনের মধ্যে রেখে নিঃশ্বাস নিলে এক ধরনের নেশা হয়। এর ফলে ক্ষুধা ও শরীরের যন্ত্রণা থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে এ নেশা শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। শিশুদের ক্ষতির পরিমাণ আরো বেশি। মাদক গ্রহণের কারণে তাদের সুষ্ঠু বিকাশ বিঘিœত, লেখাপড়ায় ক্ষতি এবং সামাজিকীকরণে সমস্যা হয়।
আমাদের সমাজে বসবাসরত অনেক শিশু এই ভয়াল নেশার ফাঁদে আটকা পড়ছে। এর থেকে বের হতে পারছে না। এ ব্যাপারে মনোরোগ ও মাদকাসক্তি চিকিৎসাবিদদের মতে, বস্তির শিশু, রাস্তার টোকাই এবং যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের সন্তানেরাই আগে মাদক নিতো। এখন সমাজের অভিজাত শ্রেণির ছেলে-মেয়েরাও মাদক নিয়ে থাকে। সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের মাদক গ্রহণের সংখ্যা বেশি। মাদকের সহজলভ্যতাই এর মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। যারা মাদকের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে তারা শিশু ও কিশোরদের বিভিন্ন কৌশলে প্রলুব্ধ করে। কৌতূহলী হয়েও শিশুরা মাদক নেয়। শুরুতে তারা বলে নেশা করবো না, শুধু একটু খেয়ে দেখি। একসময় তারা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে যায় ও স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে ফেলে। কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়াসহ নানা ধরনের শারীরিক ক্ষতি হয়। শুধু দেহ নয়, মননশীলতা, চিন্তা-ভাবনা, মমতা, ভালোবাসা সবকিছুই শেষ হয়ে যায়। মাদকসেবীরা অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। পথশিশুরা রাস্তায় বড় হয়। মাদকই তাদের একমাত্র বিনোদন। মাদকের বিনিময়ে অপরাধী চক্র তাদের কাজে লাগায়। ভয়ংকর অস্ত্র তুলে দেয় তাদের হাতে। এভাবে একসময় তারা সমাজের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। সমাজ থেকে তারা হয় নিঃগৃহীত।
প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, নেশা করার জন্য টাকা না পেয়ে সন্তান তার মা-বাবাকে খুন করছেÑ স্বামী, স্ত্রীকে খুন করছে। মাদকের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সমাজে বেড়েই চলেছে। মাদকের টাকা যোগাড় করতে মানুষ খুন করতে কুন্ঠাবোধ করছে না মাদকাসক্তরা।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রÑ বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও মোস্ট অ্যাড রিস্ক অ্যাডোলসেন্ট (এমএআরএ) নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার পথশিশু রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে থাকে তিন লাখেরও বেশি পথশিশু। এদের বেশীরভাগই মাদকে আসক্ত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে, ২০১০ সালে প্রণীত মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা বিধিমালা অনুসারে কেন্দ্র পরিচালনার জন্য অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নেয়ার কথা। কিন্তু রাজধানীতে অনেকগুলো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠলেও এগুলোর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেরই নিবন্ধন নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে এটি নিরাময়যোগ্য, তবে সময় সাপেক্ষ। সরকারি পর্যায়ে শিশুদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। মাত্র ৪টি সরকারি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তবে মাদকাসক্ত শিশুদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চাইল্ড সেনসিটিভ সোশ্যাল প্রোটেকশন অব বাংলাদেশ (সিএসপিবি) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কিছু স্থানে ড্রপ ইন সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে মাদকাসক্ত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অথবা পরিবারে বা সমাজে নির্যাতিত, লাঞ্ছিত শিশুরাই পরবর্তীতে মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ে। তাই মা-বাবার উচিৎ সন্তানদের সাথে মাদকের কুফল নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা। সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করা। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, ফেশবুকের বন্ধু কারা, স্কুলের বন্ধু কারা, তাদের বন্ধুদের সাথে কথা বলতে হবে। বন্ধু নির্বাচনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তাই মাদক নির্মূল সরকারের পাশাপাশি সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকের কুফল সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে। শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। মাদকাসক্ত শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিবারের সকল সদস্যদের সৌহার্দপূর্ণ আচরণ দেখাতে হবে। যাদের অভিভাবক নেই তাদের সহায়তায় বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে মাদকের ভয়াবহতা থেকে অনেকটা রক্ষা করা যাবে আমাদের শিশুদের।

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ