নির্বাচনের রাজনীতি: খুলনা-২ যেখানে দুই দলই সমানে সমান

বিভাগীয় শহরটি খুলনা-২ আসনে পড়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েরই প্রায় সমান ভোটব্যাংক রয়েছে এ আসনে। সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালে। তখন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরে যান বিএনপির কাছে। কিন্তু ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র দেড় হাজারের মতো।

জাতীয় সংসদের শততম এ আসনটি খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা থানা নিয়ে গঠিত। বর্তমানে মোট ভোটার ২ লাখ ৯০ হাজার ৩১৫। পুরো বিভাগে এ আসনকে সবচেয়ে মর্যাদার চোখে দেখেন নেতারা। ফলে ভোটের আগে মনোনয়নের লড়াইটা বেশ জমে ওঠে।

এক নৌকায় কজন উঠবেন?
খুলনা-২-এ বর্তমান সাংসদ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। তিনি নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ১৪ দলের সমন্বয়ক। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ‘একতরফা’ নির্বাচনে ৯৫ শতাংশ ভোট পান তিনি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির রাশিদা করিম। বিএনপি জোট ওই নির্বাচন বর্জন করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও মিজানুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন। সেবার তিনি বিএনপির নজরুল ইসলামের কাছে হেরে যান ১ হাজার ৬৭০ ভোটের ব্যবধানে।
হার-জিত যাই হোক, ওই দুটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককাট্টা ছিল। মিজানুর রহমান ছিলেন দলের একক প্রার্থী। তবে আগামী নির্বাচনে একই নৌকায় একাধিক নেতা পা রাখতে চাইছেন। প্রার্থী হতে আগ্রহী জাহাজ ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলামও। তিনি খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ইতিমধ্যে জোর প্রচারে নেমে পড়েছেন তিনি।
সাইফুল নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেকের অনুসারী। খালেকের সঙ্গে সাংসদ মিজানুরের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব নেই। তবে সাইফুল-মিজানুর দ্বন্দ্ব বেশ স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাইফুলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলে এলাকায় প্রচার আছে। তিনি খুলনা সিটি নির্বাচনেও প্রার্থী হতে আগ্রহী।
সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, সিটি নির্বাচনের আগেই সংসদ নির্বাচন হবে। এ কারণে আমি আওয়ামী লীগের হয়ে খুলনা-২ আসনে নির্বাচন করতে আগ্রহী। তবে দল যাঁকে মনোনয়ন দেবে তাঁর পক্ষেই কাজ করব।’ মিজানুরের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়ে তিনি বলেন, দুজনের রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন। এ শহরে কে কী ধরনের রাজনীতি করেন, তা সবাই জানে। তাই এটি আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই।
মিজানুর রহমান সাংসদ হওয়ার পর খুলনা নগরে একক আধিপত্য গড়ে তুলেছেন। অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। তিনি গত সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় নিজেকে ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এ বিষয়ে সাংসদ মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। বারবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করে এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় সম্প্রতি আরও একজন যোগ দিয়েছেন। তিনি হলেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও সাবেক ফুটবলার সালাম মুর্শেদী। ৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে খুলনা আওয়ামী লীগের জনসভায় হঠাৎ করেই বক্তব্য দেন মুর্শেদী। খুলনা থেকে যাঁরা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন, তাঁদের বিজয়ী করতে তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন।
জানতে চাইলে সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘আমার বাড়ি খুলনায়। এখানেই বড় হয়েছি। এখন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমিও চাই এলাকার মানুষের জন্য কিছু করতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে এখান থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যে আসনেই আমাকে মনোনয়ন দেবেন, আমি সেই আসন থেকেই নির্বাচন করতে আগ্রহী। তিনি যদি আমাকে মনোনয়ন না-ও দেন তাতে আমার কোনো দুঃখ থাকবে না। আমি দলের একজন সদস্য হয়েই কাজ করব।’

বিএনপির প্রাধান্য
স্বাধীনতার পর এ আসনে বিএনপিরই প্রাধান্য দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ জিতেছে মাত্র দুবার। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের এম এ বারী, ’ ৭৯ সালে মুসলিম লীগের খান এ সবুর আর ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির মো. মহসীন এখানে সাংসদ নির্বাচিত হন। তবে’ ৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতা সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী এখানে সাংসদ হন। সেই থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আসনটি বিএনপিরই ছিল।’ ৯৬ সালের নির্বাচনেও বিএনপির রাজ্জাক আলী সাংসদ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ আসনে সাংসদ হন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আসনটি ছেড়ে দেন। পরে সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ হন বিএনপির আলী আসগার।

বিএনপিতেও কোন্দল
২০১৬ সালের নভেম্বরে থানা কমিটি গঠন নিয়ে নগর বিএনপির নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু। সেই দ্বন্দ্ব এখনো চলছে। এক পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নগর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও খালিশপুর থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম আরিফুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আছেন নগর, খালিশপুর ও দৌলতপুর থানার বেশ কিছু নেতা-কর্মী। অন্য পক্ষে আছেন নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম। নগরের নেতা-কর্মীদের মূল অংশই রয়েছে তাঁর সঙ্গে। দুটি পক্ষই আলাদাভাবে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করে।
এ আসনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নজরুল ইসলাম আলোচনায় আছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি নিয়েই সংশয় আছে। তেমন পরিবেশ হলে এবং দল মনোনয়ন দিলে তিনি নির্বাচন করবেন। দল থেকে নির্বাসিত কোনো ব্যক্তি মনোনয়ন পাবেন না বলে তিনি মনে করেন।
সরাসরি না বললেও এই ‘নির্বাসিত’ নেতা বলতে তিনি আলী আসগারকে বুঝিয়েছেন। আলী আসগার খুলনার রাজনীতিতে এখন নিষ্ক্রিয়, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাইরে। তবে একাদশ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে আলোচনা আছে। যদিও তাঁর পক্ষে এখন পর্যন্ত এলাকায় কোনো প্রচার নেই। তবে নজরুল ইসলামের প্রতিপক্ষ আরিফুর মূলত আলী আসগারের অনুসারী।
আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আলী আসগার এবার এ আসন থেকে বিএনপির হয়ে মনোনয়ন চাইবেন। তিনি কিছুটা অসুস্থ থাকায় এলাকায় কম আসেন। তিনি আরও বলেন, নজরুল ইসলাম নিজের দখলেই সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন। তিনি ইচ্ছেমতো দল পরিচালনা করেন। তাঁর সঙ্গে মূলত দ্বন্দ্ব এ কারণেই।

অন্যান্য দল
জোট মহাজোটের বাইরে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এ আসনে প্রার্থী দেবে বলে জানা গেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আবদুল আউয়াল চূড়ান্ত হয়েছেন। তিনি নগরের গোয়ালখালী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ।

Comments..
sidebar
আগের সংবাদ
পরের সংবাদ